Type to search

সুদমুক্ত অর্থনীতির মূলভিত্তি যাকাত : ১ম পর্ব 

ধর্ম

সুদমুক্ত অর্থনীতির মূলভিত্তি যাকাত : ১ম পর্ব 

বিলাল মাহিনী : সুদভিক্তিক অর্থব্যবস্থায় গরিব আরও গরিব হতে থাকে, অপরদিকে ধনী ও পুঁজিপতিদের ধন দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় ধনীর সম্পদে গরিবের নির্দিষ্ট পরিমান অধিকার থাকায় ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর হতে থাকে। যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্র করা, বৃদ্ধি পাওয়া (বস্তুত: যাকাত দিলে মাল পবিত্র হয় এবং বৃদ্ধি পায়।) পারিভাষায় যাকাত হলো, ‘কোন অসচ্ছল গরীব মুসলমানকে বা মুসলমানদেরকে কোন প্রকার বিনিময় ও শর্ত ছাড়া যে সকল মালের উপর যাকাত প্রযোজ্য ঐ মালের (বর্তমান বাজারের বিক্রয় মূল্যের) চল্লিশ ভাগের এক অংশের মালিক বানানো। (আদ্দুরুল মুখতার ২:২৫৬)
মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারায় বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহ ব্যবসায়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’ সুদের আরবি পরিভাষা হলো ‘রিবা’। আর ‘রিবা’ শব্দটির অর্থ হলো ‘আসলের অতিরিক্ত যোগ হওয়া’। আর ইংরেজীতে বলা হয়  Interest. Oxford dictionary-তে Interest এর অর্থ করা হয়েছে `the extra money that you pay back when you borrow money or that you reciece when you invest money.’ এছাড়াও Encyclopedia of Wikipedia-তে বলা হয়েছে- “Interest is a fee paid by a borrower of assets to the owner”.
বাংলা পরিভাষায় ‘ঋণের  অর্থ ব্যবহারের জন্য প্রদত্ত অর্থকে সুদ বলা হয়।’ পবিত্র কুরআনে মূলত এ আসলের অতিরিক্ত যোগ হওয়াকে অবৈধ তথা হারাম বলে ঘোষনা করা হয়েছে। সুদের বৈশিষ্টের মধ্যে রয়েছে- ক) সুদ ঋণের সাথে জড়িত সেটা অর্থ-ঋণ হোক বা পণ্য-ঋণ। খ) আসলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া। গ) সময়ের অনুপাতে বৃদ্ধিও পরিমান নির্ধারিত হওয়া। ঘ) সময়ের অনুপাতে আসল বৃদ্ধি পাওয়াকে ঋণের শর্ত হিসেবে গ্রহন করা।  সহীহ বুখারীরর ‘রিবা’ অধ্যায়ের টিকাতে উল্লেখ আছে যে, ‘রিবা’ বা ‘সুদ’ দুই প্রকার।
ক) ‘রিবা নাসিয়া’ আর তা হলো ‘এমন ধরনের ঋণ যা অন্যকে ব্যবসার জন্য দেয়া হয় এবং নির্দিষ্ট হারে সুদ আদায় করা হয় এ ঋণের উপর।’ আর এ ঋণ যেহেতু কোন না কোন সময়ের জন্যই হয়ে থাকে, সেজন্য রিবা নাসিয়া হচ্ছে সময়ের সাথে অর্থের বিনিময়। অন্য কথায়, ‘ঋণে সেই মেয়াদকালকে নাসায়া বলা হয় যা ঋণদাতা আসল ঋণের উপর নির্ধারিত পরিমাণ অতিরিক্ত প্রদানের শর্তে ঋণ-গ্রহীতাকে নির্ধারণ করে দেয়। সুতরাং রিবায়ে নসিয়া হচ্ছে ঋণের উপর সময়ের প্রেক্ষিতে ধার্যকৃত অতিরিক্ত অংশ। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, ঋণদাতা নাসির ঋণগ্রহীতা মাজিদকে এই শর্তে ১০০টাকা এক বছরের জন্য ঋণ দিলো যে এক বছর পর মাজিদ উক্ত ১০০ টাকা আসলের সাথে অতিরিক্ত ১০ টাকা ফেরত দেবে। এক্ষেত্রে এই অতিরক্তি ১০ টাকা ১০০ টাকার ১ বছরের বিনিময় বা রিবা নাসিয়া। রাসূল স. এর হাদীস হতেও রিবা নসিয়ার ঐ অর্থ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন ‘নাসিয়া’ ব্যতীত রিবা নেই এবং ‘প্রতীক্ষাতেই রিবা রয়েছে’। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ঋনের উপর ধার্যকৃত সুদকে বলা হয় রিবা নাসিয়া।
খ) ‘রিবা ফাদল’ এটা হলো এক প্রকার মালের পরিবর্তে অন্য ভালো/উৎকৃষ্ট মানের বা বেশি পরিমাণ দ্রব্য বিনিময়। অর্থাৎ- খারাপ মালের পরিবর্তে ভালো মাল বা কম মালের পরিবর্তে বেশি পরিমাণ মালের বিনিময়। অন্য ভাবে বলা যায় যে, একই জাতীয় পণ্যেও কম পরিমাণের সাথে বেশী পরিমাণ হাতে হাতে বিনিময় করা হলে দ্রব্যের অতিরিক্ত পরিমানকে বলা হয় ‘রিবা ফাদল’ সুতরাং উক্ত উভয় প্রকার ‘রিবা’ বা সুদ হারাম বা নিষিদ্ধ। সহীহ হাদীসে এ বিষয়ে বর্ণনা আছে। সহীহ মুসলিমের ৩নং খন্ডের ৬২৩ নং অধ্যায়ের ৩৮৯৪৫ হতে ৩৮৯৪৯ নং হাদীস পর্যন্ত। এই পাঁচটি হাদিসে উভয় প্রকার সুদ হারাম করা হয়েছে।
স্মরণ রাখতে হবে, আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর হারাম করেছেন সুদ। সুতরাং ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন করা হালাল। রাসূল স. নিজে ব্যবসা-বানিজ্যে অংশ গ্রহণ করেছেন। ব্যবসায় সম্পর্কে তিনি বলেছেন-‘রুজীর দশ ভাগের নয় ভাগই রয়েছে ব্যবসা-বানিজ্যেও মধ্যে’ (কানযুল আমল)। তিনি আরো বলেছেন-‘সত্যবাদী, ন্যায়পন্থী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী আম্বিয়া, সিদ্দীক ও শহীদদের সমান মর্যাদায় অবিষিক্ত হবে’ (তিরমিযি)।
মুনাফার পরিচয়: পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে মোট আয় হতে মোট উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার পর ব্যবস্থাপনার হাতে যা উদ্বৃত্ত থাকে, তাকে বলা হয়েছে মুনাফা। সুতরাং মুনাফার পূর্ব-নির্ধারিত কোন হার বা অংশ নেই। অন্যকথায়, মুনাফা হচ্ছে বিনিয়োজিত পুঁজির  বর্ধিত অংশ, আর লোকসান হচ্ছে পুঁজির ক্ষয়প্রাপ্ত বা খোয়া যাওয়া অংশ। মুনাফার ইংরেজী প্রতিশব্দ হলো Profit. Profit=total revenueÑtotal expenses. Encyclopedia of Wikipedia- তে Profit এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে- ‘A finalcial benefit of that is realized when the amount of revenue gained from a business activity exceeds the expenses, costs and taxes needed to sustain the activity.
উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, কোন উদ্যোক্তা কোন ব্যবসায় ১ লক্ষ টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করে এক বছর পর যাবতীয় খরচ বাদে যদি ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা পায়, তাহলে বর্ধিত ২০ হাজার টাকা হবে তার মুনাফা। এ হলো পুঁজিবাদী অর্থনীতির মুনাফার সংঙ্গা। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতিতে মোট আয় হতে উৎপাদন খরচ হিসেবে কেবল জমির খাজনা ও শ্রমের মুজুরী বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তাকেই বলা হয় মুনাফা। ইসলামী আইনে বলা হয়েছে যে, ‘মুনাফা হচ্ছে সম্পদের এমন প্রবৃদ্ধি যা কোন অর্থনৈতিক কারবারে সম্পদ বিনিয়োগ করার ফলে অর্জিত হয়।’ এক কথায়, মুনাফা তাই পুঁজিকে রূপান্তরিত কওে ঝুঁকি গ্রহনের ফল।আরো বলা যায় যে, মুনাফা হলো মানবীয় শ্রমের সাহায্যে পুঁজি খাঁটিয়ে ঝুঁকি গ্রহন করার ফল।
            সুদ ও মুনাফার পাথর্ক্য : ক) মুনাফা ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসার স্বাভাবিক ফলস্বরূপ অর্জিত হয়, কিন্তু সুদ অর্জিত নয়, ঋণ ও সময়ের উপর ধার্যকৃত হস্তান্তরিত আয় মাত্র।  খ) মুনাফা হলো উদ্যোক্তার পুঁজি, শ্রম ও সময় বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি গ্রহণের ফল, কিন্তু সুদের ক্ষেত্রে ঋণদাতা পুঁজি, শ্রম ও সময় বিনিয়োগ এবং ঝুকি গ্রহণ করেনা। অর্থ ধার দেয় মাত্র। গ) মুনাফা অনির্ধারিত ও অনিশ্চিত, কিন্তু সুদ পূর্ব নির্ধারিত ও নিশ্চিত। এত ঋণদাতার আয় নিশ্চিত কিন্তু গ্রহীতার লাভের নিশ্চয়তা নেই। সুদ ও মুনাফা মূলত ‘এক রকম হয়েও হলো না এক’ ধরনের একটি বিষয়। সুদ ও মুনাফার পার্থক্য যারা মানতে চায় না, পবিত্র কুরআনে তাদের তিরষ্কার করা হয়েছে। সুরা বাকারার ২৭৫ নং আয়তে বলা বলা হয়েছে-“যারা সুদ খায় তারা তাদের মত দন্ডায়মান যাদেরকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে, এটা এ কারণে যে তারা বলে ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতই। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম”।
             সুদ ও ব্যবসার পার্থক্য: একটি উদাহরণ : প্রচলিত অর্থনীতির ঋণ প্রদান পদ্ধতির সাথে ইসলামী অর্থনীতির ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতির সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও শরীয়তের দৃষ্টিতে দুটি এক নয়। যেমন: এক ব্যক্তি কাউকে ১০০ টাকা ঋণ দিয়ে ১০ টাকা সুদ ধার্য করে টাকা পরিশোধের জন্য ১ বছর সময় দিল। আরেকজন কারো নিকট ১০০ টাকার মাল ১১০টাকায় বিক্রি করে টাকা পরিশোধের জন্য ১ বছর সময় দিল। দুটো কি এক? টাকা আদায়ের মেয়াদ, হিসাব, লাভ সবই এক। তথাপি প্রথমটি ঋণের আর দ্বিতীয় টি ব্যবসা। সুতরাং উপরোক্ত দুটি বিষয় কারো কাছে ঘুরিয়ে খাওয়া মনে হলে তা তার চিন্তার দৈন্যতা ছাড়া আর কিছু নয়।
            বাস্তব ভিত্তিক উদাহরণ : এক ব্যক্তি জন সমক্ষে অপর ব্যক্তিকে বলল, ‘আপনি আপনার মেয়েটিকে আমার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য দিয়ে দিন। এজন্য ১লক্ষ টাকা দেবো।” লোকটি এবং তার মেয়ে যদি এ প্রস্তাবে রাজি হয়, তহলে তারা যে কাজটি করবে তা হবে একটি জঘন্য অপরাধ (ব্যভিচার)। পক্ষান্তরে লোকটি যদি অন্যভাবে বলেন, “আপনি আপনার মেয়েকে আমার কাছে বিয়ে দিন। তার বিয়ের মোহরানা ১লক্ষ টাকা।” লোকটি এবং তার মেয়ে যদি এ প্রস্তাব গ্রহন করে তাহলে তাদের সম্পাদিত কাজটি একটি মহৎ কাজ বলে গন্য হবে। শরীয়তের এ মহৎ কাজটি বিবাহ বলে গন্য হবে।করো কাছে মনে হতে পরে, দুটির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, একটিতে বিবাহ ও মোহরানা শব্দ ছিল অন্যটি’তে ছিলনা। কিন্তু তাই বলে কি দুটি কে মৌলিকভাবে এক বলা যাবে? ইসলামী ব্যাংকের সাথে সুদ ভিত্তিক ব্যাংকের পার্থক্য অনেকটা এরকমই। কাজ কর্ম সবই দৃশ্যত এক হতে পারে, কিন্তু কাজের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা।
            ইসলামী  অর্থ ব্যবস্থা বা ব্যাংকিং সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারনার নিরসনঃ একজন মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে দৈহিক আকার-আকৃতি, খাওয়া-দাওয়া, কথা-বার্তা ইত্যাদি বহু বিষয়ে মিল থাকতে পারে। মানুষ হিসেবে তাদের মধ্যে এরূপ মিল থাকা স্বাভাবিক। তাই বলে কি তাদেরকে এক মনে করা যাবে? তাদের পার্থক্যটা আসলে বিশ্বাস ও কর্মে। অনুরূপভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচলিত ব্যাংকের সাথে ইসলামী অর্থব্যবস্থা বা ব্যাংকের বহু বিষয়ে সাদৃশ্য থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের আসল পার্থক্য হলো বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতিতে। ইসলামী অর্থব্যবস্থা বা ব্যাংক আল্লাহর বিধান ও শরীয়তকে মানব জাতির কল্যানের উৎস রূপে বিশ্বাস ’করে এবং তদনুযায়ী যাবতীয় কর্ম-কান্ড পরিচালনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রচলিত ব্যাংকের এ ধরনের বিশ্বাস ও পতিশ্রুতি নেই।
             সুদের লেনদেনের পরিণাম : মুসলিম ও তিরমিযী শরীফের মধ্যে এসেছে, মহানবী স. বলেন-“তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তারা সবাই সমান পাপী। সুদের লেনদেন মূলত: একপ্রকার ধোঁকাবাজী, এ প্রসংঙ্গে মহানবী স. সিহাহ সিত্তাহ’র হাদীসের মধ্যে বলেছেন-“যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজী করে সে আমার তরিকার লোক নয়।”আমরা জানি যে, আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, তবে সে ব্যবসা হতে হবে বিশ্বনবী স. এর দেখানো পথ অনুযায়ী, যেমন মহানবী স. মুসনাদে আহমদের মধ্যে ঘোষনা করেছেন-“যে ব্যক্তি ইহতিকার করবে অর্থৎ অতিরিক্ত দামের আশায় চল্লিশ দিন যাবৎ খাদ্যদ্রব্য বিক্রয় না করে আটকে রাখবে আল্লাহর সাঙ্গে তার ও তার সঙ্গে আল্লাহর সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাব”। এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, সুদ ও ঘুষ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মত, অর্থৎ সুদ ও ঘুষ হলো আঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আর তাই মহানবী স. বুখারী ও মুসলিম শরীফের মধ্যে বলেছেন-“ঘুষ গ্রহনকারী ও ঘুষ প্রদানকারী উভয়ের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।”
            সুদের মারাত্মক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ পাক সূরা রূমের ৩৯ নং আয়াতে বলেন- “মানুষের অর্থের সাথে শামিল হয়ে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এ আশায় তোমরা  সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাকো, তারই দ্বিগুন লাভ হয়।” সূরা বাকারার ২৭৬ নং আয়াতে আরো বলিষ্ঠ ভবে বলা হয়েছে-“আল্লাহ সুদকে ধ¦ংস করে দেন”। এখনে বলা হয়েছে-“আর এ কারনে যে, তারা (ইহুদীরা) সুদ গ্রহন করতো অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, এবং এ কারনে যে তারা অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতো। বস্তুত আমি কাফিরদের জন্য তৈরী করে রেখেছি বেদনাদায়ক শাস্তি। তারপর সূরা আলে ই¤্রানের ১৩০ নং আয়াতে বলা হয়েছে-“হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেয়ো না, আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, যাতে তোমারা কল্যান অর্জন করতে পারো।” পবিত্র কুরআনে সব ধরনের সুদ কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, হোক তা মাত্রাতিরিক্ত বা পরিমিত।
            অনেক মুসলমান আছেন, যারা জোর দিয়ে বলেন যে, কুরআন যে সুদের কথা বলেছে তা মানি লন্ডারিং-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর মানি লন্ডারিং হলো মাত্রাতিরিক্ত সুদ যা কুরআন নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু Interest নিষিদ্ধ করে নি, যা বর্তমানের আধুনিক ব্যাংকগুলি নিয়ে থাকে। আমাদের  Usury  শব্দের অর্থ বুঝতে হবে, Oxford dictionary-তে বলা হয়েছে ‘The Practice of lending money to people at unfairly high rates of interest” অর্থাৎ অন্যায্যভাবে অর্থ ধারের ব্যবসা। তারা বলে, কুরআন এ মাত্রাতিরিক্ত হারে সুদের লেনদেন হারাম করেছে কিন্তু বর্তমানের আধুনিক ব্যাংকগুলো যে সুদ নেয় তা নিষিদ্ধ করা হয় নি।  আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের সুরা আল-বাকার ২৭৫ নং আয়াতে  বলেছেন-“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, সুদ (আসলের অতিরিক্ত) কে করেছেন হারাম।” সুতরাং যারা সুদী কারবারের সাথে জড়িত তারা মহান আল্লাহর শাস্তির শিকার হবে। তাদের অবস্থান হবে চিরস্থায়ী জাহান্নাম। যেমনি ভাবে পরবর্তী আয়াতে ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে-“আল্লাহ তায়ালা সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং দান খয়রাতকে বর্ধিত করেন, আর আল্লাহ পছন্দ করেননা কোন অবিশ্বাসী পাপীকে।”
           আবার পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ২৭৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে তা পরিত্যাগ কর। যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।”এর পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে- “অত:পর তোমরা যদি পরিত্যাগ না কর তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। আর যদি তোমরা তাওবা করো তাহলে তোমরা তোমাদের মূলধন ফেরৎ পাবে। তোমরা জুলুম করো না, তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।” সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে নবী করীম স. বলেন-“হযরত যাবের রা. বর্ণনা করছেন ‘যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদেও হিসাব লিখে ও সুদের সাক্ষী দেয় রাসূল স. তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, এরা সবাই সমান অপরাধী”। আরো বর্ণিত আছে, হযরত আবদুল্লাহ হানতা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে সুদের একটি টাকা খায়, সে ৩৬ বার যিনার চেয়ে ও বেশি অপরাধ করল।’ ইবনে মাজাহ ও বায়হাকী শরীফের মধ্যে জলীলুল কদর সাহাবী হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, মহানবী সা. বলেন, ‘সুদের পাপের মধ্যে ৭০টি অংশ রয়েছে, তার ক্ষুদ্রতম অংশের পরিমান হলো মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।’ (চলবে..)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *