
নড়াইল প্রতিনিধি
নড়াইলে দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষার পর এক সঙ্গে সাত সন্তানের জন্ম দিয়েছেন সালমা বেগম নামে এক গৃহবধূ। ওই দম্পতির ঘর আলো করে চারটি ছেলে ও তিনটি মেয়ে সন্তান এলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালুখালী গ্রামে এ ঘটনায় এলাকায় গভীর শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বেলা ১১টার দিকে নবজাতকদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
স্বজনরা জানান, গত সোমবার রাতে সালমা বেগমের প্রসব বেদনা উঠলে তাকে দ্রুত যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে মঙ্গলবার রাতে প্রথমে দুটি এবং বুধবার রাতে একে একে আরও পাঁচটি সন্তান প্রসব করেন তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে (মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস) ভূমিষ্ঠ হওয়ায় নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হয়। বর্তমানে মা সালমা বেগম যশোরেরই একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কালুখালী গ্রামের লতিফ মোল্যার ছেলে মহসিন মোল্যা ১০ বছর আগে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় সাত বছর প্রবাস জীবন কাটান। তিন বছর আগে দেশে ফিরে বর্তমানে তিনি ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিয়ের এক দশক পার হলেও এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না। সম্প্রতি আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে ছয়টি সন্তানের কথা জানা গেলেও বাস্তবে সাতটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়।
এর আগে পাঁচ বছর আগে সালমা বেগম একবার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন, কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাতের কারণে সেবার সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ ১০ বছর পর সালমা আবারও অন্তঃসত্ত্বা হলে চিকিৎসক জানান, তার গর্ভে ছয়টি সন্তান রয়েছে। তবে প্রসবের সময় চিকিৎসকের সেই রিপোর্টকে ভুল প্রমাণ করে একে একে সাতটি সন্তান জন্ম নেন।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইলা মণ্ডল জানান, সালমা বেগম তার তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়েছেন। তার সন্তানগুলো অপরিপক্ক অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছে। সালমার পানি ভেঙ্গে যায়। পাঁচ মাসে ২০০ গ্রাম করে ওজন হয়েছে। সবার হার্টবিট ছিল। তবে, শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
মহসিন মোল্যার মা জানান, ছয়টি সন্তানের খবর জানতে পেরে পরিবারে আনন্দের জোয়ার বইছিল। পুত্রবধূর সেবাযত্নে কোনো কমতি ছিল না। গত সোমবার (৪ মে) বিকেলে হঠাৎ সালমার প্রসব বেদনা শুরু হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মঙ্গলবার রাতে প্রথম সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হয়।
নবজাতকটি কিছুক্ষণ পর মারা গেলে মহসিনের বাবা মৃতদেহটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। এরপর রাতে আরও একটি সন্তান প্রসব করেন সালমা। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় শিশুটিও মারা যায়। বুধবার রাতে একে একে আরও পাঁচটি সন্তান প্রসব করেন তিনি। জন্মের কিছুক্ষণ পর প্রতিটি শিশুই মারা যায়।
নবজাতকদের দাদা আব্দুল লতিফ মোল্লা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে আগে সৌদি আরবে থাকত। তিন বছর আগে দেশে এসে ইজিবাইক চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছে। বিয়ের ১০ বছর পর নাতিনদের মুখ দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। আল্লাহ আমাদের খুশি দিলেও তা আর সইল না। এই কষ্ট রাখার জায়গা নেই।’
দাদি মঞ্জুরা খাতুন জানান, নাতিনদের মুখ দেখার আশায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছিলেন তারা, কিন্তু মুহূর্তেই সব আনন্দ বিষাদে পরিণত হলো।
স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু সেলিম বলেন, মহসিন মোল্লার সাতটি সন্তান হবে এমন খবর শুনে পুরো গ্রামে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ খবর নিতে আসছিল। কিন্তু আজ শিশুগুলোর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছ।
