উপ-সম্পাদকীয়
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে বিশ্ব আজ তথ্যের এক অভূতপূর্ব প্রবাহের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় সংবাদ ছিল পত্রিকা, টেলিভিশন বা রেডিওর মতো নির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র। কিন্তু ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে তথ্যপ্রচারকে এনে দিয়েছে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়। ফলে আজ যে কেউই কনটেন্ট নির্মাতা, আবার অনেক ক্ষেত্রেই ‘সংবাদদাতা’ হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন।
এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে তথ্যপ্রবাহকে গণমুখী ও বহুমাত্রিক করেছে। আগে যেখানে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর মূলধারার গণমাধ্যমে খুব কমই প্রতিফলিত হতো, এখন তা সামাজিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজেই সামনে আসছে। স্থানীয় সমস্যা, সামাজিক অসাম্য, কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-সবকিছুই এখন বৈশ্বিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক যোগাযোগব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিক।
তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে এসেছে এক গভীর সংকট-বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। সাংবাদিকতার যে মৌলিক ভিত্তি-তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতা-তা অনেক ক্ষেত্রেই কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জগতে অনুপস্থিত। দ্রুত ভিউ, লাইক বা শেয়ার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেকেই যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার করছেন, যা সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। গুজব এখন আর ধীরগতির কোনো বিষয় নয়; বরং তা মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে-তাহলে দায় কার? পেশাদার সাংবাদিকদের, নাকি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের? বাস্তবতা হলো, দায় উভয়েরই। কারণ তথ্যপ্রচার যখন জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে, তখন তার প্রভাবও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পেশাদার সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরে একটি নীতিগত কাঠামোর মধ্যে কাজ করে আসছেন। তাদের জন্য রয়েছে সম্পাদনা প্রক্রিয়া, ফ্যাক্ট-চেকিং, এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। অন্যদিকে, অধিকাংশ কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই কাঠামোর বাইরে কাজ করেন। ফলে সেখানে ব্যক্তিগত মতামত ও তথ্যের মধ্যে বিভাজন অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই অস্পষ্টতাই বিভ্রান্তির প্রধান উৎস।
বর্তমান সময়ের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ বা তথ্যের অতিরিক্ত চাপ। একজন সাধারণ পাঠক প্রতিদিন অসংখ্য তথ্যের সম্মুখীন হচ্ছেন, যার সবগুলো যাচাই করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে তিনি সহজেই বিভ্রান্তিকর বা আংশিক সত্য তথ্যের শিকার হতে পারেন। এই পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত-বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলছে। এখন এমন ভিডিও বা অডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখতে বা শুনতে সম্পূর্ণ বাস্তব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ভুয়া। এই ধরনের প্রযুক্তি যদি দায়িত্বহীনভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা সমাজে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করবে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় করতে হবে, একই সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের একটি ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি হওয়া জরুরি। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মিডিয়া লিটারেসি’ বা তথ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। মানুষকে জানতে হবে কীভাবে একটি তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে নির্ভরযোগ্য উৎস চিহ্নিত করতে হয় এবং কীভাবে আবেগনির্ভর বা প্ররোচনামূলক কনটেন্ট থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হয়।
সবশেষে, এই সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন-উভয়ই আজ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তবে এই শক্তি তখনই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, যখন তা সত্য, নৈতিকতা এবং দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। অন্যথায় তথ্যের এই বিস্ফোরণই হয়ে উঠতে পারে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উৎস। -আফজাল হোসেন চাঁদ, গণমাধ্যমকর্মী, ঝিকরগাছা, যশোর।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ কামরুল ইসলাম
মোবাইল নং : ০১৭১০৭৮৫০৪০
Copyright © 2026 অপরাজেয় বাংলা. All rights reserved.