সুনিল দাস
আদর্শ শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছেন। তিনি ২০১০ সালে অভয়নগর উপজেলার ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। তার বিদায় অনুষ্ঠানে এক হৃদয় স্পর্শী নজিরবিহীন জনতার ঢল নামে। সে দিন অনেক প্রাক্তন ছাত্রদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে তিনি কিভাবে ছাত্রদের উৎসাহিত করে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনা করিয়েছেন।
একজন মানুষের জীবন কখনো কেবল চাকরি বা ডিগ্রির তালিকা নয়—তা হয়ে ওঠে ত্যাগ, সংগ্রাম ও নীরব সুকর্মের এক দীর্ঘ ইতিহাস। যশোর অঞ্চলের প্রবীণ শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের জীবন ঠিক তেমনই এক অনুকরণীয় অধ্যায়।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস জন্মগ্রহণ করেন এক শিক্ষিত পরিবারে। তাঁর পিতা রসিকলাল বিশ্বাস ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মাতা কিরণময়ী বিশ্বাস। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শিক্ষাকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।
বহুমুখী শিক্ষাসাধনা
১৯৬৯ সালে তিনি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে বিএড এবং ১৯৯৮–৯৯ শিক্ষাবর্ষে দর্শন শাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এর পাশাপাশি সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে গভীর অনুরাগ থেকে তিনি কাব্যতীর্থ ও ব্যাকরণতীর্থ উপাধি অর্জন করেন। মানবসেবার আরেকটি ক্ষেত্র হিসেবে তিনি ডিএইচএমএস (হোমিওপ্যাথি) কোর্সও সম্পন্ন করেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন
১৯৬৯ সাল থেকেই শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। শিকারপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জঙ্গবাঁধাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন তিনি।
১৯৮৩ সালের ৭ মার্চ থেকে ২০১০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছাব্বিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সততা, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ—এই তিনটি গুণেই তিনি এলাকায় সুপরিচিত ছিলেন।
১৯৭১-এর যুদ্ধ ও পারিবারিক দায়িত্ব
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল ১৯৭১ সালে তিনি শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করেন। যুদ্ধশেষে দেশে ফিরে পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নেন। ছোট দুই ভাই ও এক বোনের লেখাপড়া, বোনের বিয়ে—সব দায়িত্ব একাই সামলান। সে সময় নিজের সংসার জীবনের কথা ভাবার সুযোগ পাননি।
শিক্ষকতার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চালিয়ে তিনি সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেছেন। মা–বাবার মৃত্যুর পরও পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্বে তিনি অবিচল থেকেছেন। জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে অবশেষে সংসার জীবনে প্রবেশ করেন।
ত্যাগের ফল
জীবনের প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার পুরস্কার—তিনটি রান্নাঘর দেখা।”
আরও বলেন, তাঁর পরের ভাই তাঁদের দম্পতির তীর্থভ্রমণের সমস্ত ব্যয় বহন করেছেন—যা তিনি ত্যাগ ও সুকর্মের প্রতিদান হিসেবেই দেখেন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের জন্য করা ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না।
বর্তমান জীবন
বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৭ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। বয়সজনিত কিছু সমস্যা ছাড়া তিনি সুস্থ আছেন এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন। তাঁর দুই ছেলে—বড় ছেলে দেবাশীষ (তাঁরই একজন ছাত্র) ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং ছোট ছেলে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। সন্তানদের প্রতিষ্ঠা দেখে তিনি তৃপ্ত।
নম্র কণ্ঠে তিনি বলেন, “ভগবানের কৃপায় ভালো আছি। সবাই ভালো থাকুক—এই কামনা।”
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের জীবন প্রমাণ করে—নীরব ত্যাগ, সৎ কর্ম ও মানবিকতা মিলেই একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে বড় করে তোলে।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ কামরুল ইসলাম
মোবাইল নং : ০১৭১০৭৮৫০৪০
Copyright © 2026 অপরাজেয় বাংলা. All rights reserved.