
নড়াইল প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-০১ (কালিয়া ও সদরের একাংশ) এবং নড়াইল-০২ (লোহাগড়া উপজেলা ও সদরের একাংশ) বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দলীয় প্রার্থী ছাড়াও বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেকটা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এদিকে জামায়াত-ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জোট শেষ মূহুর্তে সমঝোতা না হওয়ায় এ জোটেও অস্বস্থি দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, নড়াইল-০১ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়নপত্র জমা দিলেও স্বতন্ত্র হিসেবে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, জিয়া পরিষদ নড়াইল জেলা কমিটির সদস্য বি এম নাগিব হোসেন, লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অবঃ) এস এম সাজ্জাদ হোসেন, নড়াইল-০১ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি ধীরেন্দ্রনাথ সাহার ছেলে হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুকেশ সাহা আনন্দ এবং ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত সাকিব হাসান নামে এক তরুণও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
এ ছাড়া এ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারী সংগঠন মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী মাওলানা ওবায়দুল্লাহ কায়সার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার উপদেষ্টা হযরত মাওঃ আব্দুল আজিজ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওঃ আব্দুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির মো. উজ্জল মোল্যা এবং জাতীয় পার্টি (এরশাদ) মো. মিল্টন মোল্যা, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মাহফুজা বেগম ও আপন ভাই আসজাদুর রহমান, স্বতন্ত্র গাজী খালিদ আশরাফ সাদী, গাজী মাহবুয়াউর রহমান এবং এস এম সাজ্জাদ হোসেন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অবঃ) এস এম সাজ্জাদ হোসেন প্রান্তিককে বলেন, ২০১৮ সালে আমি নড়াইল-০১ আসন থেকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেলেও পরে আমার পরিবর্তে বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমকে দেয়া হয়। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে আমি মাঠে রয়েছি। আমার নিজ যোগ্যতায় নড়াইলের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এ আসনের সবাই আমাকে চেনেন। আমি মনে করি দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ পর্যন্ত এ আসনে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হয়নি। আমার দক্ষতা রয়েছে, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচন করবো। জনগন যদি যোগ্য মনে করে তাহলে তারা আমাকে বেছে নেবেন।
একইভাবে নড়াইল-০২ আসনে প্রথমে নড়াইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলামকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দিলেও পরে তাকে পরিবর্তন করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। এ আসনের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত মনিরুল ইসলামের মনোনয়ন ফিরিয়ে দেবার দাবিতে তাঁর সমর্থকরা কয়েকদিন নড়াইল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্ত্বরে কাফনের কাপড় পরে অনশন,মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। পরে তিনি এ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন।
তাঁর সর্থকদের দাবি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম গত ১৬ বছর বিভিন্ন মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন জেল খেটেছেন। এইসব আন্দোলন সংগ্রামে ফরিদুজ্জামান ফরহাদের কোন অবদান নেই, তাকে নড়াইলের কেউ চেনেন না এবং তার সাথে কোন কর্মী-সমর্থক নেই। ফলে এ আসনে প্রার্থী পরিবর্তন না করলে আসনটি হাতছাড়া হতে পারে। এ ছাড়া ত্যাগি নেতাদের মূল্যায়ন করা না হলে ভালো লোক বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত হবেন না এবং ত্যাগি-পরিক্ষীত নেতৃত্বের জন্ম হবে না। বিএনপিতে এক ধরণের বিশৃংখলা তৈরি হবে এবং সন্ত্রাসের জনপদ হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলামকেই মনোনয়ন ফিরিয়ে দেবেন বলে আশা তাঁদের।
এদিকে বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কাজে লাগিয়ে মাঠে জামায়াত ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনসহ ও তাদের সাথে জোটবদ্ধ দলগুলি ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও এ জোটের মধ্যেও অস্বস্থি রয়েছে। কারণ ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ নড়াইল-০২ আসনটি দাবি করছে।
নড়াইল-০২ আসন থেকে বাকি যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে তারা হলেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী জেলা আমীর মোঃ আতাউর রহমান বাচ্চু, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জেলা শাখার সহ-সভাপতি মাওঃ তাজুল ইসলাম, খেলাফত মজলিস থেকে মুফতি আবদুল হান্নান সরদার, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোটের মোঃ সোয়েব আলী, গণ অধিকার পরিষদের মো. নূর ইসলাম, জাতীয় পার্টির খন্দকার ফায়েকুজ্জামান এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ফরিদা ইয়াসমিন।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ নড়াইল জেলা শাখার জেনারেল সেক্রেটারি এস এম নাসির উদ্দীন প্রান্তিককে বলেন, এ আসনে আমাদের সংগঠন অত্যন্ত মজবুত। আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে এ আসনটির জন্য জোর দাবি জানিয়েছি। তা ছাড়া আমাদের মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে এখনও সমঝোতা হয়নি। আমরা ৭০-৭৫ টি আসনের দাবি জানিয়েছি।
এ বিষয়ে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর নড়াইল-০২ আসনে প্রার্থী মোঃ আতাউর রহমান বাচ্চুকে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে পূর্বে নেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, বলেন,নড়াইলে জামায়াতের অবস্থা এখন অনেক শক্তিশালী। ইতোমধ্যে এ আসনের প্রচার-প্রচারণা কয়েকবার সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনী পরিচালনা কমিটি ও পোলিং এজেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। এ আসনে আমাদের কমপক্ষে দেড় লাখ ভোট রয়েছে। জনগনের প্রচুর সাড়া পেয়েছি এবং পাচ্ছি। এককভাবে হোক বা ইসলামী দলগুলো নিয়ে জোটগতভাবে হোক আসনে আমরা ইনশাল্লাহ জয়ী হবো।
প্রসঙ্গত নড়াইল-০১ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৫৫ এবং নড়াইল-০২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯০ হাজার ৯৮৭ জন।

