প্রতি সপ্তাহের সোম আর শুক্রবারে জেলার সবচেয়ে বড় ডোঙার হাট বসে সদর উপজেলার তুলারামপুর বাজারে।সকাল সাতটা থেকে শুরু হওয়া এই হাট চলে দুপুর পর্যন্ত। সকাল থেকেই বিক্রেতারা হাটে নিজেদের তৈরি ডোঙা নিয়ে জড়ো হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ক্রেতাও। দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা মুখর থাকে পুরো হাট। তাছাড়া মূল সড়কের পাশেই হাটের অবস্থান হওয়ায় ক্রেতার পাশাপাশি ভ্যানচালকেরাও সকাল থেকে হাটে ভিড় জমান। ক্রেতার কেনা ডোঙা বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতেই সকাল সকাল হাজির হন তারা।
নড়াইলের বাইরে সাতক্ষীরা ছাড়াও যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, মাগুরা,গোপালগঞ্জ থেকে ক্রেতারা আসেন এই হাটে ডোঙা কিনতে।গাছের বয়স,মান ও আকৃতির উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়ে থাকে ডোঙার দাম।
তুলারামপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়,শেষ মুহূর্তের আঁচড় দিয়ে তালগাছের তৈরি ডোঙাগুলোকে নিখুঁত করে তুলতে ব্যস্ত কারিগরেরা।সারিবেঁধে সাজিয়ে রাখা ডোঙা গুলোর একেকটির মাথা দেখতে একেক রকম। একেকটি মাছের মাথার মতো নকশায় সাজানো ডোঙার মাথাগুলো। মাছের নামেই নাম এগুলোর। যেমন: মাগুর মাছ সদৃশ ডোঙার মাথার নাম মজগুর মাথা, কোনোটা আবার শোল মাথা, কোনোটা কাইল্লে মাথা।হাটে ক্রেতার ভিড় কিছুটা কম হলেও বিক্রির মৌসুম ফুরিয়ে যায়নি বলে আশান্বিত তারা।
দুটি ডোঙা বানাতে পুরো একদিন সময় ব্যয় হয় চার জন কারিগরের। কমপক্ষে ২০-৩০ বছর বয়সী তালগাছগুলো ডোঙা বানানোর উপযোগী বলে ধরা হয়। এক-একটি তালগাছের দাম হয় ছয় থেকে আট হাজার টাকা। প্রতিটি তালগাছকে মাঝামাঝি দুইভাগ করে তৈরি হয় দুটি ডোঙা। তালগাছের মাঝের নরম অংশ বাদ দিয়ে শক্ত খোলস দিয়ে গড়া হয় এই বাহন। তৈরির পর ঘষে ঘষে মসৃণ করা হয় ডোঙার ভেতর এবং বাইরের অংশ। সাধারণ নৌকার মতো বাইরের অংশে কোনো আলকাতরা বা রং ব্যবহার করা হয় না ডোঙায়। নৌকার তুলনায় দামে কম আর সহজে বহনযোগ্য বলেই মূলত এই অঞ্চলে সমাদৃত ডোঙা।
স্রোতহীন কম গভীর জলে পারাপার, মাছ ধরা, শাপলা তোলা, ধান-পাট কাটা, শামুক সংগ্রহে স্থানীয়দের সহজ আর সুলভ বাহন এটি। ছোট কোনো বাঁশকে বৈঠা হিসেবে নিয়ে ডোঙায় করে খাল-বিল বা ছোট নদীর উপর ভাসতে দেখা যায় এলাকার শিশুদেরও।
সদর উপজেলার চর শালিখা গ্রাম থেকে নিজের বানানো ডোঙা নিয়ে তুলারামপুরের হাটে বিক্রি করতে এসেছেন সোহাগ শেখ।ছোটবেলা থেকেই বাবা চাচাদের কাছ থেকে ডোঙা বানাতে দেখেছেন তিনি।হাটে ডোঙা নিয়ে এসেছেন। কথা হলে তার সাথে তিনি বলেন, বাবা চাচাদের কাছ থেকে কাজ শিখেছি৷ এখন বড় ভাইরা করেন। তাদের সাথে আমি ও ডোঙা তৈরির কাজ করি। এখন ডোঙা বানায়। তুলারামপুর হাটে বিক্রি করি।প্রথমে গাছ কিনি। তার গাছটি দুই খন্ঠ করে কাটি। তারপর ডোঙা তৈরি করি।শুক্রবার হাটে ছয়টি ডোঙা আনি আর সোমবার হাটে চারটি ডোঙা আনি। এ ব্যবসয়ায় লাভ সীমিত। এক একটা ডোঙা তিন হাজার চার হাজার বিক্রি করি।বড় ডোঙা ছয় থেকে দশ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। আগের দিনের চেয়ে চাহিদা কমলেও এখনো দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে আমাদের ডোঙা কিনতে।'
ডোঙা কিনতে হাটে এসেছেন মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার রিপন কুমার বিশ্বাস। মূলত, মাছ ধরা,শাপলা তোলা, শামুক আহরণের জন্য জন্য তিনি ব্যবহার করেন এটি।রিপন বলেন,'হাটে ডোঙা কিনতে এসেছি। অনেকগুলো দেখছি। একটা ডোঙা পছন্দ হয়েছে৷ সেটি সারি আছে ভাল। সেটি দাম দর করেছি। তারা সাড়ে আট হাজার টাকা চেয়েছে। আমি তাদের সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা বলেছি। আমরা অন্য ডোঙা দেখছি যদি পছন্দ হয় ও দরদামে পটে তাহলে কিনে নিয়ে যাব৷ তিনি আরো বলেন, ডোঙার আয়ু নির্ভর করে গাছের সারের উপর। গাছের সার আছে কি না চেনার উপায় হইলো ডোঙার গায়ে কালো দাগ থাকা। কালো দাগ থাকলে সে ডোঙার দামও বেশি হয় আর টিকেও বেশিদিন।
সকাল সকাল মাগুরা শালিখা থেকে তুলারামপুরের হাটে ডোঙা কিনতে এসেছেন রমেশ বিশ্বাস। তার বাড়ির পাশে নদী ও বিলে মাছ ধরার কাজে তার ব্যবহৃত হয় এই ডোঙা। হাটে ঘুরে বেশ কয়েকজন কারিগরের সঙ্গে দরদাম করে অবশেষে সাড়ে আট হাজার টাকায় একটি ডোঙা পছন্দ করলেন তিনি। রমেশ জানান, ' হাটে সাজানো ডোঙা ঘুরে ঘুরে দেখছি। দামটা একটু বেশি চাচ্ছে।যদি সেই রকম পর্তা হয় তাহলে ডোঙা কিনব৷প্রায়ই এই হাট থেকে ডোঙা কিনতে আসে আমাদের এলাকার মানুষজন।'
নড়াইলের বাইরে সাতক্ষীরা ছাড়াও যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, মাগুরা, গোপালগঞ্জ থেকে ক্রেতারা আসেন তুলারামপুর হাটে ডোঙা কিনতে। বর্ষাই মূলত ডোঙা বিক্রি জমে উঠে।বংস পরম্পরায় সদরের চরশালিখা গ্রামের কারিগরিরে তালগাছের গুঁড়ি থেকে ডোঙা বানাচ্ছেন।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে নড়াইল জেলা বিসিক কার্যালয়ে উপব্যবস্থাপক মো. সোলায়মান হোসেন বলেন,"চরশালিখা গ্রামে প্রায় একশত পরিবার আছে। যারা তালগাছ থেকে ডোঙা তৈরি করেন। এটি তাদের আদি পেশা৷ বংস পরম্পরায় তারা এটি করে থাকেন। সেই ক্ষেত্রে এই পণ্যের মানটা অনেক ভাল। তারা তাদের এই পর্ন্যটাকে প্রথমে তুলারামপুর হাটে বিক্রি করেন। তাদের আদি পেশা টিকিয়ে রাখার জন্য শিল্পের অভিভাবক হিসাবে বিসিক সবধরনের সহযোগিতা করে থাকে।তুলারামপুর ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায় যেমন যশোর, খুলনা,মাগুরা সহ বিভিন্ন জায়গা বিক্রি করে থাকেন।