-আফজাল হোসেন চাঁদ
মুসলিম উম্মাহর দ্বীন ও দুনিয়ার এক মহিমান্বিত মেলবন্ধনের নাম ঈদুল আজহা। এটি কেবলই আনন্দ-উৎসবের অবগাহন নয়; এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এক সুগভীর জীবন দর্শন, আধ্যাত্মিক চেতনা এবং আত্মশুদ্ধির চিরন্তন বার্তা। ত্যাগের সুমহান ইতিহাসে ভাস্বর এই দিনটি প্রতি বছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে এক বুক মানবিকতা, সামাজিক সমতা ও মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্যের সুমহান শিক্ষা নিয়ে। আধুনিক সভ্যতার জাঁকজমক আর ভোগবাদী সংস্কৃতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত এই সমকালীন সমাজে ঈদুল আজহার প্রাসঙ্গিকতা এবং এর অন্তর্নিহিত দর্শন আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে।
কোরবানির ঐতিহাসিক পটভূমি ও হাকিকত- কোরবানির ইতিহাস মূলত পরম আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অনন্য মহাকাব্য। আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর যুগ থেকে কোরবানির বিধান চলে আসলেও, বর্তমান মুসলিম উম্মাহ যে নিয়মে কোরবানি আদায় করে, মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) এর সেই অভূতপূর্ব আনুগত্য ও ঐতিহাসিক ত্যাগ মানব ইতিহাসে সর্বোচ্চ আত্মসমর্পণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মহান আল্লাহর নির্দেশে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, বার্ধক্যের একমাত্র আলো-নূর-ই-নয়ন হযরত ইসমাইল (আ.)- কে মিনার প্রান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবেহ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। পিতা ও পুত্রের এই অভূতপূর্ব আনুগত্য ও ঐতিহাসিক ত্যাগ আল্লাহ তাআলার দরবারে এতটাই মকবুল ও পছন্দনীয় হয়েছিল যে, তিনি জবেহ করার মুহূর্তে ইসমাইলের স্থলে একটি জান্নাতি দুম্বা প্রতিস্থাপন করে দেন। এই বিস্ময়কর ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক হিসেবেই কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিমের ওপর কোরবানিকে ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে জারি রাখা হয়েছে। পশু কোরবানির বাহ্যিক অবয়বের আড়ালে যে আধ্যাত্মিক 'হাকিকত' বা প্রকৃত সত্য লুকিয়ে আছে, তা হলো নিজের ভেতরে লালিত সব ধরনের পশুত্ব, অহংকার, নফসানি খায়েশ (কুপ্রবৃত্তি), লোভ, হিংসা ও সংকীর্ণতাকে মহান আল্লাহর চরণে উৎসর্গ করা। কোরবানি কোনো লৌকিক প্রদর্শনী বা সামাজিক আভিজাত্যের প্রতিযোগিতা নয়। এর মূল হাকিকত হলো তাকওয়া অর্জন করা। মানুষের অন্তরের নিয়ত এবং আল্লাহভীতির গভীরতাই কোরবানির প্রধান মাপকাঠি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন-“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না কোরবানির রক্ত বা মাংস; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।” (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৭)
কোরবানির ফজিলত ও পুণ্যময় সওয়াব- ইসলামী শরিয়তে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য কোরবানি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার জীবনে প্রতি বছর কোরবানি করেছেন এবং উম্মতকে এর ফজিলত সম্পর্কে গভীরভাবে আশ্বস্ত করেছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে কোরবানি করার চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর নিকট প্রিয় আর কোনো আমল হতে পারে না। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সন্তুষ্টি অবতীর্ণ হয়। হযরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই কোরবানি গুলো আসলে কী ? রাসুল (সা.) বললেন, “এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কী সওয়াব রয়েছে ? জবাবে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করলেন, “কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি বা সওয়াব রয়েছে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে অনুধাবন করা যায়, একটি পশুর গায়ে কোটি কোটি পশম থাকে, যা গণনা করা অসম্ভব। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে এই ইবাদতের মাধ্যমে অফুরন্ত ও সীমাহীন পুণ্য দান করেন। অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, “যে ব্যক্তির কোরবানি করার সামর্থ্য রয়েছে অথচ সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।”
সামাজিক সমতা ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দর্শন- ঈদুল আজহা কেবলই একটি ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এর একটি বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক রয়েছে, যা সমাজে সাম্য ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোরবানির মাংসকে তিন ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ নিজেদের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং বাকি এক ভাগ সমাজস্থ দরিদ্র, অসহায় ও ইয়াতিম-মিসকিনদের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব। এই সুষম বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার যে চিরন্তন অর্থনৈতিক বৈষম্য, তা সাময়িক ভাবে হলেও বিলুপ্ত হয়। সারা বছর যারা পুষ্টিকর খাবার বা মাংস কিনে খেতে পারে না, এই দিনে তাদের ঘরে ঘরে আনন্দের আলো জ্বলে ওঠে। আজকের এই পুঁজিবাদী ও চরম আত্মকেন্দ্রিক সমাজে, যেখানে মানুষ কেবল নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত, সেখানে ঈদুল আজহা আমাদের শেখায় কীভাবে নিজের সম্পদ অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে হয়। একজন প্রকৃত মুমিনের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সে চারপাশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। কোরবানি আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় ঐক্যের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। তবে বর্তমান সময়ে আমাদের এই ঈদের মূল শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই লোকদেখানো উৎসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। হাটে গিয়ে লাখ লাখ টাকা দিয়ে পশু কেনার মাধ্যমে ত্যাগের মহিমার চেয়ে নিজেদের আভিজাত্য আর অহংকার প্রদর্শনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক-ইউটিউব) এর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। অথচ ঈদের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত পশু কেনার সামর্থ্যের পেছনে অন্তরের সততা ও আল্লাহভীতি কতটা অটুট ছিল।
পরিবেশ সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ- ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক দায়িত্ব পালন করাও ঈমানের অন্যতম অঙ্গ। কোরবানির পশু জবাই এবং বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে আমাদের চরম সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অসচেতনভাবে যত্রতত্র পশু জবাই করলে এবং রক্ত ও বর্জ্য সময়মতো পরিষ্কার না করলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়, যা বিভিন্ন রোগব্যাধি ও দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। ইসলামে বলা হয়েছে, ‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’। তাই ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ যেন কোনো ভাবেই জনদুর্ভোগ বা পরিবেশ দূষণের কারণ না হয়, সেদিকে আমাদের কঠোর নজর দিতে হবে। নিজ দায়িত্বে কোরবানির স্থানটি পানি ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করা এবং বর্জ্যগুলো সুনির্দিষ্ট স্থানে বা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা প্রতিটি সুনাগরিকের অপরিহার্য কর্তব্য। একটি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রেখে ঈদ উদযাপন করাই ইসলামের প্রকৃত চেতনা।
জীবনব্যাপী ত্যাগের চেতনায় পরিশেষে বলা যায়- ঈদুল আজহার শিক্ষা কেবল নির্দিষ্ট একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এই ত্যাগের মহিমাকে আমাদের সমগ্র ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বছরব্যাপী ধারণ করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়ার যে দীক্ষা আমরা এই ঈদ থেকে পাই, তা-ই হোক আমাদের পথচলার মূল প্রেরণা। আসুন, এই পবিত্র ঈদুল আজহায় আমরা শুধু পশুর গলায় ছুরি না চালিয়ে, আমাদের ভেতরের অহংকার, সংকীর্ণতা, পরশ্রীকাতরতা, দুর্নীতি ও অন্যায় প্রবণতাকে কোরবানি দিই। আমাদের অন্তর হোক কলুষমুক্ত, সমাজ হোক শান্তিময় আর মানবতা হোক মহিমান্বিত। তবেই আমাদের কোরবানি আল্লাহর দরবারে সার্থক ও মকবুল হবে, এবং ঈদুল আজহা সত্যিকার অর্থে মানবতার কল্যাণময় উৎসবে রূপান্তরিত হবে। সবাইকে জানাই পবিত্র ঈদ উল আজাহার শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক। লেখক- আফজাল হোসেন চাঁদ, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, ঝিকরগাছা, যশোর।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ কামরুল ইসলাম
মোবাইল নং : ০১৭১০৭৮৫০৪০
Copyright © 2026 অপরাজেয় বাংলা. All rights reserved.