
মোস্তফা মোহাম্মদ মনজুরুল মোরশেদ
রমজান মাস মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার। রাসূলুল্লাহ (সা.) রজব মাস শুরু হলেই রমজানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন এবং বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। হাদিস ও সীরাতের আলোকে তাঁর প্রস্তুতির বিষয়গুলো নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:
### ১. মানসিক প্রস্তুতি ও আকুতি (দোয়া করা)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রস্তুতি শুরু হতো মূলত মানসিক আকুতি দিয়ে। রজব মাস এলেই তিনি আল্লাহর কাছে রমজান পর্যন্ত হায়াত বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতেন।
* **হাদিস:** আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রজব মাস শুরু হলে নবীজি (সা.) এই দোয়াটি পড়তেন:
> *“আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।”*
> **(মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকি)**
> যদিও সনদের দিক থেকে মুহাদ্দিসগণ কিছু কথা বলেছেন, তবুও রমজান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা নিয়ত হিসেবে এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাহর অনুসারী। এর মাধ্যমে মুমিনের অন্তরে রমজানের আবহ তৈরি হয়।
### ২. শাবান মাসে অধিক নফল রোজা রাখা
রমজানের মূল প্রস্তুতি হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) রজবের পরের মাস, অর্থাৎ শাবান মাসে প্রচুর নফল রোজা রাখতেন। এটি ছিল ফরজ রোজার শারীরিক ও আত্মিক মহড়া।
* **হাদিস:** উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন,
> *“আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে বেশি (নফল) রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতে দেখিনি।”*
> **(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)**
* অন্য এক হাদিসে উসামা বিন যায়েদ (রা.) প্রশ্ন করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! শাবান মাসে আপনাকে যত রোজা রাখতে দেখি, অন্য মাসে তা দেখি না, এর কারণ কী?”
উত্তরে নবীজি (সা.) বলেন: *“এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস, যে সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ এই মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, রোজা রাখা অবস্থায় যেন আমার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়।”* **(নাসায়ী)**
### ৩. দিন-তারিখ গণনা করা (সতর্কতা)
রমজান যেন ভুল দিনে শুরু না হয়, সে জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের দিন-তারিখ খুব গুরুত্বের সাথে গণনা করতেন।
* **হাদিস:** আয়েশা (রা.) বলেন,
> *“রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের (দিন-তারিখের) হিসাব নিতেন, যা অন্য মাসের ক্ষেত্রে নিতেন না। পরে চাঁদ দেখে রমজানের রোজা রাখা শুরু করতেন।”*
> **(আবু দাউদ)**
### ৪. অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত ও ইবাদত
যদিও নির্দিষ্ট কোনো হাদিসে “রজব মাসে কুরআন খতম” এর কথা বলা নেই, কিন্তু সাহাবা ও সালাফদের আমল থেকে বোঝা যায়, তাঁরা রজব ও শাবান মাসকে কুরআন তিলাওয়াতের মৌসুম মনে করতেন। একে বলা হতো **’কুরআন পাঠকদের মাস’**। রমজানে যেন দীর্ঘ সময় কুরআন পড়ার অভ্যাস থাকে, তার চর্চা রজব থেকেই শুরু হতো।
### ৫. একটি চমৎকার উদাহরণ (সালাফদের উক্তি)
বিখ্যাত বুজুর্গ আবু বকর আল-ওয়াররাক আল-বালখি (রহ.) চমৎকার একটি উপমা দিয়েছেন, যা প্রস্তুতির সারসংক্ষেপ:
> *“রজব হলো বীজ বপনের মাস, শাবান হলো জমিতে (গাছে) পানি সেচ দেওয়ার মাস, আর রমজান হলো ফসল তোলার মাস।”*
**সারসংক্ষেপ:**
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রস্তুতির মূল শিক্ষা হলো—হঠাৎ করে রমজানে প্রবেশ না করা, বরং রজব থেকে দোয়ার মাধ্যমে মানসিক প্রস্তুতি এবং শাবান মাসে নফল রোজা ও ইবাদতের মাধ্যমে শারীরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
অধ্যাপক
রসায়ন বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ।

